মাল্টিটাস্কিং
Share with your friends
  •  
  •  
  •   
  •  

এক সঙ্গে একাধিক কাজ করা কি আপনার জন্য ভালো?

এক সঙ্গে একাধিক কাজ করা বা মাল্টিটাস্কিং আমরা অনেক সময় করে থাকি। কখনো ব্যাপারটা অভ্যাসে পরিণত হয়, অনেক সময় বাধ্য হয়ে করতে হয় আবার কখনো হয়তো বাহাদুরি করেও অনেকে একইসাথে কয়েকটা কাজ করতে পছন্দ করে।
সময় বাচানোর জন্য আমরা মাল্টিটাস্কিং এ উদ্বুদ্ধ হই। অনেক সময় আমরা আমাদের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে মাল্টিটাক্সিং এ পারদর্শী হওয়া উচিৎ মনে করি। ব্যাপারটি যেহেতু গুন হিসেবে দেখা হয়, কোম্পানির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি গুলোতেও মাল্টিটাস্কিং এ পারদর্শী কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এখন প্রশ্ন হলো এই মাল্টিটাস্কিং এর বিষয়টি কি আদৌ আপনার কর্মদক্ষতা বাড়াচ্ছে নাকি আগের চাইতেও কমিয়ে দিচ্ছে?

মাল্টিটাস্কিং কি?

আজ পর্যন্ত মিশিগান থেকে শুরু করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাল্টিটাস্কিং বিষয়ে অগণিত গবেষণার ফলাফলে যে বিষয়টি জানা গেছে তা হলো, মাল্টিটাস্কিং আসলে সম্ভব নয়। যখন আমরা ভাবি মাল্টিটাস্কিং করছি, তখন আসলে দুটো কাজ একসঙ্গে করছি না, বরং দুটো কাজের মধ্যে খুব দ্রুত একটা থেকে আরেকটা তে সুইচ করে চলেছি। খুব দ্রুত ফোকাস পাল্টানোর ফলে, পাল্টানোর ব্যাপার টা আমাদের কাছে ধরা পরে না। অর্থাৎ, মাল্টিটাস্কিং যদিও বা সম্ভব হয়, মাল্টিফোকাস একেবারেই অসম্ভব।
গবেষনার ফলাফলে আরো জানা যায়, দুটো কাজ পর পর না করে একসাথে করলে সবসময়ই *সময় বেশি লাগে, এবং *ভুল বেশি হয়।

মাল্টিটাস্কিং কেন সম্ভব নয়?

সবার মনে এই প্রশ্নটি আসা খুব স্বাভাবিক যে কেন একসাথে একাধিক বিষয়ে মনযোগ দেয়া সম্ভব নয়। উত্তর হলো, আমাদের মস্তিষ্ককে সেভাবে ডিজাইনই করা হয়নি। মাল্টিটাস্কিং করার সময় Executive Control Process কাজ করে যা ব্রেইনের Prefrontal cortex দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এক্সিকিউটিভ কন্ট্রোল প্রসেস দুইটি ধাপে কাজ করে। ১. Goal Shifting, ২. Rule activation।

Goal Shifting পর্যায়ে ব্রেইনের কাজ হচ্ছে task A তে মনোনিবেশ করা।

Rule Activation পর্যায়ে ব্রেইনের কাজ হচ্ছে task A এর জন্য ব্যাবহৃত নিয়মগুলো বন্ধ করে দিয়ে task B এর জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মগুলোকে মনে করা।
মাল্টিটাস্কিং করা অবস্থায় মস্তিষ্কে এই দুইটি পর্যায় বার বার খুব দ্রুত আবর্তিত হতে থাকে।
বিষয়টি কে একটি উদাহরণ এর সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাক।
২০০১ সালের একটি গবেষণায় একদল সেচ্ছাসেবীকে মাল্টিটাস্কিং করতে দেওয়া হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কিছু সহজ গনিত সমাধান করার সঙ্গে সঙ্গে কিছু জ্যামিতিক গঠনের ( geometric shapes) শ্রেণিবিন্যাস করতে দাওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ কন্ট্রোল প্রসেস এর দুইটি ধাপ খুব সহজ ভাবে লক্ষ করা যায়। প্রথমে গনিতের সমাধান করার জন্য গনিতের সূত্রগুলো মনে করতে হচ্ছে, তারপর গনিতে কিছুটা সমাধান করে পরক্ষনেই গনিতের দিক থেকে মনযোগ সরিয়ে নিয়ে জ্যামিতিক আকৃতির কথা মনে করে নিতে হচ্ছে, তারপর দ্বিতীয় কাজে মন দিতে হচ্ছে। বার বার দ্রুত ফোকাস পরিবর্তন করার ফলে মাঝে অনেকটা সময় বাড়তি খরচ হয়ে যায়। এটিকে বলা হয়েছে Cognitive Switching Penalty অথবা মনযোগ পাল্টানোর মাশুল। এর ফলে চূড়ান্ত ভাবে কাজ শেষ করতে সময় বেশি লেগে যায় আর ভুলের পরিমানও বেশি হয়।

মাল্টিটাস্কিং কেন চিত্তাকর্ষক?

মাল্টিটাস্কিং এর বিষয়টি অত্যন্ত লোভনীয়। কিছু মানুষ এর কুফল সম্পরকে জানার পরও এটি ছাড়তে পারেন না। কোন কাজ করার সময় ডোপামিন নামক হরমোন ক্ষরিত হয় যা মষতিস্কে সাফল্য আর পুরস্কৃত হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি করে। একই সাথে একাধিক কাজ করার সময় এই ডোপামিন ক্ষরণ বৃদ্ধি পেয়ে সাফল্যের অনুভূতি তৈরি করতে থাকে যদিও কাজ ধীরগতি আর অধিক ত্রুটিপূর্ণ হয়। তাই আমরা মাল্টিটাস্কিং করেই চলি। বার বার নতুন কিছু নিয়ে ভাবার অনুভূতিতে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স খুব সহজেই বিচ্যুত আর উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ঠিক এই একই ব্যাপার ঘটে ফেসবুক চালানোর সময়। প্রতি মুহুরতে নতুন কিছু চোখের সামনে এসে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স কে সমানে উত্তেজিত করে চলে। এই আনন্দের অনুভূতিটি আমাদের একটি vicious cycle এর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। যার কারনে ফেসবুক থেকে বের হতে সবসময় অনেকটা দেরি হয়ে যায়। কারন টা সেই একই। ফেসবুক আপনার মষতিস্ক কে সারাক্ষণ মাল্টিটাস্কিং এ ব্যাস্ত রাখে।

মাল্টিটাস্কিং বন্ধকরুন এক্ষুনি

আবার মনে করুন ২০০১ সালের সেই গবেষণার কথা, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের অঙ্ক এবং জ্যামিতিক আকৃতি নিয়ে একসাথে কাজ করতে দাওয়া হয়। আমরা দেখেছি, ব্রেইনকে কিভাবে খুব দ্রুত ফোকাস পাল্টাতে থাকতে হয়। প্রথমত, অনবরত ফোকাস পাল্টানোর এই মেন্টাল জাগলিং ব্রেইনের আসল কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয়। কাজ থেকে বিচ্যুত হওয়ার পর পুনরায় ফ্লো (নিমগ্নতা) স্টেটে পৌছুতে শুধু সময় লেগে যায় তাই না, দক্ষতা ও কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, ব্রেইনকে বারংবার তার মনযোগ স্থানান্তর (attention shifting) করতে বলায় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং স্ট্রিয়েটামে অক্সিজেনেটেড গ্লুকোজ ব্যয় হয়ে যায়, যেই একই জ্বালানি ব্যয় হয় মনযোগ স্থির রাখা ( staying on the task) অবস্থায়। অর্থাৎ, কাজের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি কাজ পাল্টানোর সময় ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
তৃতীয় বিষয়টি আরও ভয়াবহ। ২০১৪ সালে পাব্লিক লাইব্রেরী অব সাইন্স এ একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারী দের মাল্টিটাস্কিং এবং ব্রেইনের গঠন পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাল্টিটাস্কিং করা ব্যক্তির মস্তিষ্কে গ্রে ম্যাটারের পরিমাণ সবচেয়ে কম। গ্রে ম্যাটার অঞ্চল নিউরন বহন করে এবং একে anterior cingulate cortex বলা হয় যা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এর কাছে অবস্থিত। এই অংশ অনুভূতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকার সাথে জড়িত।
অর্থাৎ, মাল্টিটাস্কিং আপনার ব্রেইনের গঠন পরিবর্তন করে দিচ্ছে আর সঙ্গে কমিয়ে দিচ্ছে কার্যক্ষমতা।

মস্তিষ্ককে সতেজ ও কর্মক্ষম রাখতে মাল্টিটাস্কিং কে না বলুন। এই ক্ষেত্রে আমাদের বালিঘড়ির নিয়ম অনুস্মরন করা উচিৎ। “এক সময় শুধু এক কণা বালি”। সব একসাথে না করে একটি একটি করে কাজ শেষ করুন।