Share with your friends
  •  
  •  
  •   
  •  

ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, লাওস, কম্বোডিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে আকস্মিক আক্রমণ শুরু হয় এবং কিছু সময় পরেই থেমে যায় কিন্তু অল্পসময়েই অনেক মানুষ হতাহত হয়, রক্তাক্ত হয় গোটা শহর। শহরে আসে সাইবর্গ। কিন্তু সাইবর্গ কি বা কিভাবে আসে? কেইবা পাঠায় সাইবর্গদের? দেশের প্রত্যেক ব্যক্তি ভয়ার্ত সাথে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ভয়ে আরো বেশি তটস্থ; কখন কি হয়ে যায় তা অকল্পনীয়। আর এমন গুরুতর সময়েই কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে কথা বলার জন্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ বিদেশী দূতাবাস প্রধানদের একটি সেমিনার উদ্ভোধন করতে যাবেন।
এর আগেও প্রসিডেন্টের উপর বেশ কয়েকবার আততায়ী হামলা হয়েছে তাই এইবার নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিতাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে অপ্লের জন্য তার জীবন রক্ষা পায়। সেমিনারে যাওউয়ার ইদ্দেশ্য প্রথম যে বহর টি বের হয় তা ছিল ডেমো আর তাতেই আক্রমণ করে কিছু আততায়ী যা না পরিপূর্ণ মানুষ না রোবট। তারা খুব দ্রুত চোখের রং বদলাতে পারে, তাদের চোখের মনি একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে, এমনকি ৩০ গজ দূরে থেকেও তারা ধাতব বস্তুতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। অনেকটা মুভির মতই এই কল্পকাহিনীর বই হল মাসুদ রানা সিরিজের ‘শয়তানের দ্বীপ’ নামের একটি বই।

আচ্ছা, পৃথিবীতে এত অত্যাচার, অবিচার, অনাচার, ঝগড়া-বিবাদ-কলহ, মানুষে মানুষে হানাহানি, মারামারি, দুর্নীতি, দূষণ, বিশ্বায়ন, যুদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি….. যদি পৃথিবীতে মানুষই না থাকে, কেমন হবে- বলো তো?
এই চিন্তা থেকেই পাগল বিজ্ঞানী কবীর চৌধুরী ওরফে কার্তেজ লাম্বাডা সৃষ্টি করতে চলেছে নতুন এক জাতি যারা আধা মানুষ আর আধা রোবট মানে সাইবর্গ। এরা হবে নিখুঁত, নিরেট যারা প্রায় একদম নির্ভুল। তারা তাদের সন্তাদেরকেও জন্ম দেওয়ার পরেই যন্ত্রাংশ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে নতুন নতুন সাইবর্গ সৃষ্টি করবে এবং কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ফলে দুনিয়ার বুকে কোন আঘাত, হানাহানি, রক্তপাত, পাপ-পুণ্য, ভালো-মন্দ কিছুই রবে না, থাকবে শুধু বিশুদ্ধ ও অমিত সম্ভাবনাময়ী মানুষ যারা অনেকাংশেই ঈশ্বর সমতুল্য। আর এই জাতির রকক অধীশ্বর হবে কার্তেজ লাম্বাড়া বা কবীর চৌধুরী যে বেঁচে থাকবে হাজার হাজার বছর ধরে তার সৃষ্টি নব সভ্যতার মাঝে।
‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ‘মহাবিপদ সঙ্কেত’ এমনই একটি বই যেখানে মানুষ কে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে সাইবর্গ দ্বারা নতুন সভ্যতা সৃষ্টির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

দ্য টারমিনেটর ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এক আমেরিকান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীভিত্তিক চলচ্চিত্র যেখানে অতীতের অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবার সাইবর্গ কেই সেখানে পাঠানো হয়। এই সাইবর্গ নিয়ে টিভি সিরিজ, কমিক বুক এমনিকি অনেক উপন্যাসের জন্ম হয়েছে।

সাইবর্গ কি?
Cybernetic Organism যা সংক্ষেপে সাইবর্গ নামে পরিচিত যা জীবদেহে বায়োমেট্টিক ও ওর্গানিকভাবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের দ্বারা কৃত্তিম উপাদান বা প্রযুক্তির ব্যবহারে সংশ্লেষণ করা বা উন্নত করা হয়। সাধারণত ম্যামালস বা সরিসৃপ জাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে সাইবর্গ সৃষ্টির ধারণাটি ১৯৬০ সালে ম্যানফ্রেড ক্লিনেস এবং নাথান এস ক্লাইন ব্যক্তিদ্বয়ের মাথায় উদিত হয়েছিল। কিন্তু এর মৌলিক চিন্তাধারা আরো অনেক আগের।

সাইবর্গ- মানব শরীর আর প্রযুক্তির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।সাইবর্গ হলো এমন ধরনের মানুষ, যাদের শরীরের কোনো একটি অঙ্গ যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। ফলে তারা হয়ে উঠেছেন স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে আরো উন্নত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই মানুষ এই যন্ত্র মানবের কথা ভেবে আসছে এবং বিভিন্ন সাহিত্যে তার প্রকাশ ঘটেছে। যেমন, এডমন্ড হ্যামিল্টন ১৯২৮ সালে তাঁর উপন্যাস দ্য কমেট ডুমে জৈব ও মেশিন যন্ত্রাংশের মিশ্রণ সহ মহাকাশ এক্সপ্লোরারদের উপস্থাপন করেছিলেন। ১৮৩৩ সালের প্রথম দিকে, অ্যাডগার অ্যালান পো ছোট গল্প ‘দ্য ম্যান দ্যাট ওয়াজ ইউজড আপ’; – এ সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে একটি প্রবন্ধকে বর্ণনা করেছিলেন। ১৯১১ সালে জিন ডি লা হিয়ার লে মাইস্তেরে ডেস এক্সভিতে প্রথম বিজ্ঞানী সাইবার্গ ছিলেন এমন একটি বিজ্ঞান কথাসাহিত্যিক নাইক্টাল্পকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

1944 সালে নো ওম্যান ব্রন; ছোট গল্পে, সি এল মুর একটি নৃত্যশিল্পী ডিয়ারড্রে সম্পর্কে লিখেছিলেন, যার দেহ পুরোপুরি পুড়ে গেছে এবং যার মস্তিষ্ক একটি মুখহীন তবে সুন্দর এবং নমনীয় যান্ত্রিক দেহে রাখা হয়েছিল। এরপরেই, ১৯৬০ সালে মানফ্রেড ই ক্লেইনস এবং নাথান এস ক্লাইন দ্বারা বহিরাগত পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে এমন উন্নতমানুষের ধারণার কথা বোঝাতে সাইবর্গ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। অর্থাৎ অচেতনভাবে সংহত হোমিওস্ট্যাটিক সিস্টেম হিসাবে বহির্মুখী সম্প্রসারিত সাংগঠনিক জটিল ক্রিয়াকলাপের জন্য আমরা শব্দটির প্রস্তাব দিই।

‘For the exogenously extended organizational complex functioning as an integrated homeostatic system unconsciously, we propose the term 'Cyborg'. – Manfred E. Clynes and Nathan S. Kline

সাইবর্গ এখন আর শুধু কমিক বুক, টিভি সিরিজে বিমূর্ত নয় বরং তার মূর্ত বা বাস্তব এই পৃথিবীতে। বসবাস করে সাধারণ জনমানবের সাথে। নিম্নে তুলে ধরা হলো এমন কিছু সাইবর্গ সম্পর্কে যারা আমাদের সাথেই বর্তমান…

১.কেভিন ওয়ারউইক

কেভিন ওয়ারউইক যিনি ‘ক্যাপ্টেন সাইবর্গ’ নামে সুপরিচিত। তিনি ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের একজন প্রফেসর। বিশ্বের সবচেয়ে সম্পূর্ণ সাইবর্গ হওয়ার প্রচেষ্টায় যিনি নিজেই হয়েছেন নিজের পরীক্ষাগারের বিষয়বস্তু। ১৯৮৮ সাল থেকে সাইবর্গ হওয়ার মতো বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়ে অনেক রকম পরীক্ষা তিনি নিজেই নিজের শরীরে করে থাকেন। তিনি তার বাহুতে লাগিয়েছেন এমন এক মাইক্রোচিপ যার সাহায্যে তিনি ঘরের লাইট, ফ্যান, টিভিসহ নানারকম ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং নিজের শরীরকে যুক্ত করতে পারেন ইন্টারনেটের সঙ্গে।ক্যাপ্টেন সাইবর্গ

২.নিল হারবিসন

নিল হারবিসন বিশ্বের প্রথম আইন স্বীকৃত সাইবর্গ। ৩২ বছর বয়সী হারবিসন জন্ম থেকেই বর্ণান্ধ। পৃথিবীর কোনো রং-ই দেখতে পেতেন না তিনি। কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে তিনি মুক্তি পেয়েছেন এই সমস্যা থেকে। অপারেশনের মাধ্যমে তিনি তার মাথায় স্থাপন করেন একটি এন্টেনা যা আসলে একটি ‘আইবর্গ’ বা বিশেষ ইলেকট্রিক চোখ। এই আইবর্গের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রং বুঝতে পারেন শব্দতরঙ্গ আকারে। তিনি সাইবর্গ এর ব্যাপারে বেশ আশাবাদী আর তাই যারা সাইবর্গ হতে চান তাদেরকে সাহায্যের জন্য ২০১০ সালে ‘সাইবর্গ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি মানব শরীরে বিভিন্ন সাহায্যকারী যন্ত্র প্রতিস্থাপন করার কাজ করে থাকে।

৩.ক্লডিয়া মিশেল

প্রথম মহিলা সাইবর্গ ক্লাডিয়া মিশেল মোটর বাইক দূর্ঘটনায় হাত হারান। পরবর্তিতে তার শরীরে স্থাপন করা হয় এক বায়োনিক হাত যা তার শরীরের নার্ভাস সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই প্রথম রোবটিক হাতের সাহায্যে রান্নাবান্না, কাপড় ভাঁজ করা কিংবা পানির বালতি বহন করাসহ প্রায় সব গৃহস্থালির কাজ করতে পারেন যা দেখে মনে হয় এটা স্বাভাবিক মানুষের হাতের মতোই কর্মক্ষম।

৪.জেসি সুলিভান

প্রথম বায়োনিক হাতযুক্ত সাইবর্গ গেসি সুলিভান ২০০১ সালের মে মাসে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। এই দুর্ঘটনায় তিনি তার দুটি হাতই হারান।কৃত্রিম হাত দুটি তার শরীরের নার্ভাস সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। তিনি স্বাভাবিক হাতের মতোই রোবটিক হাত দুটিকে মস্তিষ্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তার বিশেষত্ব কোনো জিনিস মুঠো করে ধরলে কত জোরে চাপ দিয়ে ধরছেন সেটাও বুঝতে পারেন।

৫.স্টেলিউস আর্কাডিও
তৃতীয় কানের সাইবর্গ স্টেলিউস আর্কাডিও বা স্টেলার্ক নামেই যিনি বেশি পরিচিত। পেশায় তিনি একজন পারফর্মেন্স আর্টিস্ট। তিনি তার বাহুতে একটি কান প্রতিস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই কানটি আমার জন্য নয়। শোনার জন্য আমার আগে থেকেই দুটি কান রয়েছে। এই তৃতীয় কানটি হলো একটি রিমোট লিসেনিং ডিভাইস। যেটি দিয়ে বিভিন্ন জায়গার মানুষ আমাকে শুনতে পাবে’।

৬.জেরি জালাভা
ফিনস প্রোগ্রামার জেরি জালাভা বাইক দুর্ঘটনায় হাতের মধ্যমা আঙ্গুল হারানোর পর তিনি নিজেই তার হাতে কৃত্রিম আঙ্গুল লাগিয়ে নেন। আর সেই আঙ্গুলের মধ্যে তিনি স্থাপন করেন একটি ২ গিগাবাইট ইউএসবি ড্রাইভ।

৭.মাইকেল চোরোস্ট

একজন আমেরিকান বইয়ের লেখক, প্রাবন্ধিক এবং পাবলিক স্পিকার। রুবেলার কারণে তিনি শ্রবণশক্তিটির মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির সাথে জন্মগ্রহণ করেন। আর তা থেকে মুক্তি পেতেই ২০০১ সালে একটি কোচলিয়ার ইমপ্লান্ট দিয়ে তাঁর শ্রবণক্ষমতা আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল এবং ২০০৭ সালে তাঁর অন্য কান স্থাপন করা হয়েছে।

৮.ম্যানেল মুউজ
ম্যানেল মুউজ বার্সেলোনায় অবস্থিত কাতালান সাইবার্গ শিল্পী যিনি নিজ দেহে ব্যারোমেট্রিক সেন্সর বিকাশ এবং ইনস্টল করার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এই সেন্সরগুলি তাকে তার খুলির বিভিন্ন গতিতে বীটের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন অনুভব করতে দেয় ফলে তিনি যে পরিবর্তনগুলি অনুভব করছেন তার উপর নির্ভর করে তিনি আবহাওয়ার পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিতে পারেন এবং সেই সাথে তিনি যে উচ্চতায় রয়েছেন তা অনুভব করতে পারেন।

উন্নত হচ্ছে প্রযুক্তি আর উন্নত হচ্ছে আবিষ্কার। সেই সাথে মানুষের দেহে প্রতিস্থাপিত বিভিন্ন প্রযুক্তি মানুষকে সাইবর্গ করতে চাইলেও মানুষ আর প্রযুক্তি যে ভিন্ন সে কথা সবসময় মাথায় রাখতে হবে। মাসুদ রানা সিরিজের মতো পাগল বিজ্ঞানী কবীর চৌধুরীর মতো যেন কোন বিজ্ঞানী না আসে যে মানুষ নিশ্চিহ্ন করে সাইবর্গ বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের শান্তি নিশ্চিত করতে চাইবে। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ পৃথিবী যেখানে মানুষ নিজেই নিজের পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার দ্বারা সকলের উন্নতি করবে।