ডাকটিকিট সংগ্রহ করার শখ রয়েছে? কিভাবে শুরু করবেন দেশী বিদেশি স্ট্যাম্প বা ডাকটিকিট সংগ্রহ করা ।

Share with your friends
  •  
  •  
  •   
  •  

ডাকটিকিট সংগ্রহ করার কথা অনেকের মুখেই এই কথা শুনা যায় । কিভাবে ডাকটিকিট সংগ্রহ করতে পারি ?  ডাকটিকেটের সাথে পরিচিত নন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল। এর জনপ্রিয়তার জন্য একে শখের রাজা বলা হয়ে  থাকে । আবার রাজাদের শখ বলেও একে শখের রাজা বলা হয় ।

কারা কারা ডাকটিকিট সংগ্রহ করতেন, জানেন ?

-আমেরিকার ৩২ তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ।
– রানি এলিজাবেথ (২)
-প্রিন্স রেইনিয়ার (৩),
-চার্লি চ্যাপলিন,
-ওয়ারেন বাফেট
-জন লেনন
-কুইন ব্যান্ডের গায়ক ফ্রেডি মার্কারি
-ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি
-টেনিস প্লেয়ার মারিয়া শারাপোভা
-দাবার গ্র্যান্ডমাস্টার আনাতোলী কারপোভ –  সহ আরো অনেকেই ডাকটিকিট সংগ্রহ করতেন ।

সত্যিই, রাজাদের শখ । এছাড়া আমরা এটাও তো শুনেছি, শখের তোলা আশি টাকা ।

কেন ডাকটিকিট সংগ্রহ করবেনঃ

শখ হলেই যে ডাকটিকিট সংগ্রহ করতে হবে, এমন তো  কোন কথা না । এর কোন না কোন উপকার তো থাকতে হবে । সারা পৃথিবীতে প্রায় ২ কোটি মানুষ ডাকটিকিট সংগ্রহ করে । বিশাল একটা সংখ্যা । ভুটানে দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত ডাকটিকিট সংগ্রহ বাধ্যতামুলক । এটা তাদের পাঠ্যসুচীর অন্তর্ভুক্ত । ভুটানের রাজস্ব আয়ের সিংহ ভাগ আসে, ডাকটিকিট থেকে । কি লাভ, ডাকটিকিট সংগ্রহ করে ?

গবেষণা আর সমীক্ষা করে, ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের কাছ থেকে যে যে কারণ সমুহ জানা যায়, সেগুলো হল –

১. আনন্দ লাভের জন্য ।
২. সহজলভ্য আর প্রায় সকলেরই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে পাওয়া যায় ।
৩. এটি একটি শিক্ষণীয় বিষয় ।
৪. ইতিহাসের ধারক ও বাহক ।
৫. দেশের সীমানার বাহিরের মানুষদের সাথে বন্ধুত্বের সেতু বন্ধন ।
৬. নতুন নতুন বন্ধু তৈরীর উপযুক্ত মাধ্যম ।
৭. মানসিক জড়তা কাটানোর একটি উপকারী মাধ্যম ।
৮. এমন একটি শখ, যা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে সহজেই তুলে দেয়া যায় ।
৯. এতে জড়িয়ে থাকে অনেকেরই ষৈশব, কৈশর, যৌবন এমনকি বার্ধক্যের স্মৃতি ।
১০. বিশেষ বিশেষ দিন সমূহকে স্মরণীয় করে রাখতে ।
১১. ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ ।
১২. সংরক্ষণ করা বেশ সহজ ।
১৩. ব্যক্তিগত জীবনে অনেক গোছালো হতে সাহায্য করে । ছোট বড় এমনকি বৃদ্ধা সব বয়সে ।
১৪. প্রতিদিনের সব ধরণের মানসিক চাপ দূর করতে টনিকের মত কাজ করে ।
১৫. অবসাদ দূর করার অন্যতম সেরা মাধ্যম ।
১৬. নিজের অবসর- অলস সময়কে কাজে লাগানোর অন্যতম সেরা একটি উপায় ।

এককথায় যে কোন দেশে, যে কোন পরিবেশে, যে কোন বয়সেই এই শখটি শুরু করা যায় ।
আর শুরু করতে বেশী আয়োজনের ও প্রয়োজনও হয় না ।

অনেক আয়োজন এর প্রয়োজন শুরু না হলেও, লেখা কিন্তু বেশ আয়োজন করেই শুরু করেছি । এবার চলুন আরেকটু বিস্তারিত ভাবে জানা যাক ।

ডাকটিকিট সংগ্রহ করার পুরো প্রক্রিয়াকে আমি ৪ টি ভাগে ভাগ করছি ।

প্রথমত- ডাকটিকিট সংগ্রহ ।
দ্বিতীয়ত- ডাকটিকিট সংরক্ষণ ।
তৃতীয়ত- ডাকটিকিট নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা ।
চতুর্থত- ডাকটিকিট সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষণ ।

ডাকটিকিট সংগ্রহঃ
যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে, সহজেই আপনি ডাকটিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন, সেগুলো হল-

** নতুন পুরোনো খাম- যেগুলো দেশ বিদেশের বিভিন্ন ডাকবিভাগের মাধ্যমে আসে, সেগুলো থেক ডাকটিকিট পাওয়া যায় । সেই খামগুলোই হতে পারে ডাকটিকিট সংগ্রহ এর সবচেয়ে ভালো মাধ্যম ।

আমি শুরুতেই এই মাধ্যমটির ব্যাপারে বলার একটা কারণ আছে । আমি নিজেও এভাবেই আমার সংগ্রহ শুরু করেছি । আমার বাবা, মামা সহ অনেক আত্মীয় স্বজন দেশের বাহিরে থাকতো । তাদের পাঠানো চিঠির খাম থেকেই আমি অনেক ডাকটিকিট সংগ্রহ করেছি । খাম থেকে ডাকটিকিট গুলো বিশেষ পদ্ধতিতে তুলে নিতাম । ইউটিউওবে এই ব্যাপারে অনেক ভিডিও পাবেন, কিভাবে ডাকটিকিটটী তুলতে হয় ।
এই কাজটির জন্য আমি এখন বেশ আফসোস করি । তাই আমি বলবো, খাম থেকে ডাকটিকিট তুলবেন না । ডাকটিকিট সমেত ওই খামগুলোর মুল্য শুধু ডাকটিকিট এর চেয়ে অনেক বেশী । কারণ খামের উপর থাকে প্রাপক এর ঠিকানা , প্রেরক এর ঠিকানা । দুই দেশেরই পোস্ট অফিসের সীল । এর সবই খুব গুরুত্বপূর্ণ । আপনার ডাকটিকিট সংগ্রহর গল্পটি প্রথমেই আপনি আলাদা করে ফেলছেন । সেটা কি ঠিক হচ্ছে ?

তাই আমার মতে, খাম সহই ডাকটিকিটটি যত্ন করে রাখা উচিত । আর খাম থেকে যদি ডাকটিকিট তুলতেই হয়, তাহলে তা খুব সাবধানতার সাথে করা উচিত । ইউটিউব এ এই ব্যাপারে অনেক ভিডিও পাওয়া যাবে । তাছাড়া আমি তো আছিই ।

** নিকটস্থ পোস্ট অফিস/ জিপিও থেকে ডাকটিকিট সংগ্রহ করা যেতে পারে । সাধারণত প্রতিটি দেশ ২ ধরণের ডাকটিকিট প্রকাশ করে থাকে ।
১. ডেফিনেটিভ (রাস্ট্রীয় কাজে ব্যবহার এর জন্য )
২. কমেমোরেটিভ (বিশেষ দিন উপলক্ষে প্রকাশ করা হয় । রাস্ট্রীয় কাজেও তা ব্যবহার করা যায় ।)

ডেফিনেটিভ ডাকটিকিট সব ধরণের পোস্ট অফিসেই পাওয়া যায়, কিন্তু কমেমোরেটিভ ডাকটিকিট শুধুমাত্র জিপিও তে পাওয়া যায় । প্রতিটি জিপিও তে ফিলাটেলিক ব্যুরো থাকে, যেখান থেকে সংগ্রাহকরা স্টকে থাকা সবগুলো ডাকটিকিট কিনতে পারবে । জিপিওতে সাধারণত মিন্ট (অব্যবহৃত) ডাকটিকিট পাওয়া যায় । আর বিভিন্ন ফিলাটেলিক শপ গুলো থেকেও ব্যবহৃত/অব্যবহৃত ডাকটিকিট সংগ্রহ করতে পারেন ।

** অনেক বন্ধুদেরই অথবা আত্মীয় স্বজনদের কেউ না কেউ দেশের বাহিরে থাকেন । তাদের মাধ্যমেও আপনি ডাকটিকিট সংগ্রহ করতে পারেন । দেশে ঠিকানায় চিঠি লিখলেই পেয়ে যাবেন ডাকটিকিট । সম্ভব হলে বেশকিছু নতুন  ডাকটিকিট খামের ভিতরে চিঠির সাথে পাঠিয়ে দিতে পারেন । এতে করে সহজেই আপনি পেয়ে যাবেন, আদান প্রদান এর জন্য  অতিরিক্ত কিছু ডাকটিকিট । সেই সাথে বাড়তে থাকবে আপনারও ডাকটিকিট সংগ্রহ ।

** এই মাত্রই অতিরিক্ত ডাকটিকিট এর কথা বললাম । মনে করুন, আমার কাছে আছে নেপালের  ৪/৫ টি স্ট্যাম্প, আর আপনার আছে ভারতের ২/৩ টা । চাইলেই আমরা সংগ্রহে না থাকা ডাকটিকিট গুলো বিনিময়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নিতে পারি । এভাবে যত বেশী বিনিময় করতে পারবেন, আপনার সংগ্রহ ততই বাড়বে । সপি বুকস এর মত সপি স্ট্যাম্প । এই কাজের জন্য আমি সবসময় আপনাদের পাশে আছি ।

** পত্র মিতালীর মাধ্যমেও আপনি নতুন নতুন বন্ধু পেতে পারেন, দেশে বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে । সেই সাথে খুলে যাবে, বিদেশের কারোও সাথে ডাকটিকিট  বিনিময়ের সম্ভাবনা । একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, লক্ষ লক্ষ ডাকটিকিট ও যদি কারোও থাকে, তার কাছে বাংলাদেশের নতুন প্রকাশিত ডাকটিকিট  কিন্তু নেই, তাই আপনি চাইলেই তাকে সেটা পাঠাতে পারেন । আর বিনিময়ে পেতে পারেন তার কাছে থেকে তার দেশের ডাকটিকিট ।

** ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের ফেসবুকে বেশ কিছু ক্লাব/গ্রুপ আছে । চাইলেই সেই গ্রুপথেকে আপনি পেয়ে যেতে পারেন, আপনার কাংখিত দেশের ডাকটিকিট ।

ডাকটিকিট সংরক্ষণঃ
সংগ্রহ তো হল, এবার সংরক্ষণ । সংগ্রহের জন্য আপনার দরকার কিছু জিনিস । সেগুলো হল-
১. ফোরসিপ বা চিমিটা
২. ম্যাগনেফাইন গ্লাস
৩. এলবাম (দেশ/থিম অনুযায়ী ডাকটিকিট সাজিয়ে রাখার জন্য )

১. ফোরসিপঃ

হাত দিয়ে স্পর্শ না করে ফোরসিপ দিয়ে ডাকটিকিট দরা উচিত । এতে করে হাতের আংগুল এর ছাপ, ময়লা, ঘাম ইত্যাদি লেগে ডাকটিকিট নস্ট হয় না । এর দাম বড়জোর ১০-৩০ টাকা ।

২. ম্যাগনেফাইন গ্লাসঃ

ডাকটিকিট এর লেখাগুলো বেশ ছোট হয়ে থাকে । তাই ভালোভাবে পড়ার জন্য আর ডিজাইনের খুটিনাটি ভালো ভাবে দেখার জন্য ম্যাগনেফাইন গ্লাস বেশ সাহায্য করতে পারে । ব্যবহৃত ডাকটিকিট এর উপর যেই সীল থাকে, সেটা ও ভালোভাবে ম্যাগনেফাইন গ্লাস দিয়ে বোঝা যায় ।

৩। এলবামঃ


এটা শুরুতেই থাকতে হবে, এমন কিন্তু নয় । অন্তত ১০০/২০০ স্ট্যাম্প সংগ্রহে জমলেই এলবাম কেনা যেতে পারে । নিউমার্কেট, মালিবাগ, ফার্মগেট এর বেশ কিছু ফিলাটেলিক শপে স্ট্যাম্প এলবাম পাওয়া যায় । এছাড়াও বই এর দোকানে ও পাওয়া যেতে পারে ।দাম ২৫০-১৫০০ টা । (সাইজ আর কোয়ালিটির উপর দাম নির্ভর করে) ।
এলবামে রাখার আগ পর্যন্ত ছোট ছোট এয়ার টাইট বক্সেও রাখতে পারেন ডাকটিকিট । আমি এখনও প্রায় ৩০ টা ছোট ছোট বক্সে ডাকটিকিট রাখি (২০ টাকা দামের আর এফ এল এর টিফিন বক্স) । এরপর সময় সুযোগ বুঝে বিষয়, দেশ অনুযায়ী এলবামে সাজাই ।

ডাকটিকিট নিয়ে পড়াশোনা আর গবেষণাঃ
ডাকটিকিট সম্পর্কিত বেশ কিছু বই পাওয়া যায় আমাদের দেশে । বেশ কিছু ওয়েব সাইটেও ডাকটিকিট সম্পর্কিত তথ্য আছে । গুগল করেও অনেক অথ্য পেতে পারেন আপনি । এছাড়া অভিজ্ঞ সংগ্রাহক ও গবেষকদের কাছ থেকেও অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন । এছাড়া জাতীয় ও জেলা ভিত্তিক ডাকটিকিট প্রদর্শনীগুলোতে অংশগ্রহণ করেও আপনি অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন । আমাকে ও জানাতে পারেন । আমিও সাধ্যমত  চেস্টা করবো তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করার ।
এছাড়া একটি ডাকটিকিট দেখেই আপনি দেশের নাম, সেই দেশের রাজধানী, ডাকটিকিটের মুল্য, ওই দেশের মুদ্রা, ডাকটিকিট প্রকাশের কারণ, স্ট্যাম্পের বিষয় সম্পর্কে টুকিটাকি তথ্যতো সহজেই আপনি বের করতে পারবেন ।

তথ্য সংরক্ষণঃ
ডাকটিকিট সম্পর্কিত বেশ কিছু তথ্যতো আপনি যোগাড় করলেন । এবার এগুলো একটা নোটবুকে টুকে রাখেন । মনে রাখবেন একদিনে সব তথ্য আপনি পাবেন না । গবেষণাও একদিনে হয় না । ধীরে ধীরে দেখবেন, একসময় আপনার সংগ্রহ সমৃদ্ধ ।

একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন । ডাকটিকিট সংগ্রহ কোন শর্ট টার্ম হবি নয় । এটা অনেক দিনের কস্ট আর ধৈর্য্যের ফসল । হুট করে ধরে, হুট করে ছেড়ে দিলে নিজেই অসন্তুস্ট হয়ে পড়েবেন ।
আর হ্যাঁ । হাজার হাজার ডাকটিকিট আপনার সংগ্রহে থাকতে এমন কোন কথাও নেই । পাখির উপরে সংগ্রহ করুন ১০০ টা স্ট্যাম্প । যে কোন দেশের । সবগুলো পাখির বাংলা ইংরেজী নাম জানুন, বৈজ্ঞানিক নাম জানুন, মজার কোন বৈশিস্ট্য জানুন । তাতেই সংগ্রহের সার্থকতা । এলবামের ৩/৪ পাতায় রঙ বেরং এর পাখি, ফুল, মনীষী, পতাকা, মানচিত্র, পশু, গাড়ি, উড়োজাহাজ প্রতিটি ২০ টা করেই রাখুন । তাহলেই দেখবেন, আপনার সংগ্রহ কত্ত সুন্দর হয়ে উঠেছে । পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারবেন সেই ডাকটিকিটগুলো নিয়ে গল্প করে ।

আপনার পছন্দের থিম অথবা বিষয় কোনটি, আমাকে জানাতে ভুলবেন না । কে জানে হয়তো, প্রথম বিনিময় টা আমার সাথেই হয়ে যাবে ।
লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ । ভালো থাকুন ।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.