সম্মানিত শিক্ষক/শিক্ষয়িত্রীদের সহিত অনেক স্মৃতির মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য স্মৃতি লইয়া একটু আলোচনা

Share with your friends
  •  
  •  
  •   
  •  

প্রিয় শিক্ষক ও আমাদের ছেলেবেলা

আসুন আরও একবার ঘন হইয়া বসুন,এই উষ্ণ বঙ্গিও সমতটের আমার আপনার শিক্ষা জীবনের সম্মানিত শিক্ষক/শিক্ষয়িত্রীদের সহিত অনেক স্মৃতির মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য স্মৃতি লইয়া একটু আলোচনা করিয়া লই।

লিখার শুরুতেই বলিয়া লই আমি ঐ সকল সম্মানিত শিক্ষক/শিক্ষয়িত্রীদের নাম সরাসরি লিখিয়া তাহাদিগনকে বিব্রত কিংবা অসম্মানিত করিতে চাহি না।

আমরা ইশকুলে হঠাৎ আবিস্কার করিলাম যে,আমাদের একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের নিকট তাহার বাসায় যাইয়া প্রাইভেট পড়িলে উক্ত ছাত্র কিংবা ছাত্রী নিজে চাহিলেও ফেল করিতে পারিবেন না,উনি এত ভাল পড়ান। আমরা উনার নাম দিয়া বসিলাম “দোকানদার” স্যার। কারন উনি রীতিমত তাহার গৃহে দোকানের মত পসরা সাজাইয়া বিভিন্ন শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের আলাদা আলাদা সময় এবং ব্যাচ করিয়া পড়াইতেছেন এবং উনি শুধু যে সকল প্রশ্ন প্রথম বার্ষিকী/দ্বিতীয় বার্ষিকী এবং ফাইনাল পরীক্ষায় আসিবে শুধু তাহাই পড়াইতেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, এই অধম উনার নিকট কখনওই পড়িতে জান নাহি, তাহা হইলে বিজ্ঞানে যে লেটার নম্বর পাইয়াছিলাম তাহা বোধকরি ধরা ছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া যাইত।

অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন যিনি তাহার নামের শেষে ছিল উনার বংশের উপাধি তাহা হইল “সমাজপতি”,আমাদের খপ্পরে পড়িয়া তাহার নতুন নাম হইল “বনস্পতি”। যতদূর মনে করিতে পারি তখন বাজারে একখান সয়াবিন তইল পাওয়া যাইত বনস্পতি ব্র্যান্ডের নামে।তো এই বনস্পতি মহোদয় ইশকুল হইতে বাহির হইয়া নিজ গৃহে না ফিরিয়া তিনি আমাদের মতন বান্দর কিসিমের ছাত্রদের ক্ষেত্র বিশেষে ছাত্রীদের গৃহে হানা দিতেন এবং তাহার অভিভাবক বিশেষ করিয়া মাতাগনের নিকট তাহার ছেলে গণিতে ভয়াবহ অবস্থায় রহিয়াছে এবং এখন হইতেই তাহাকে বনস্পতির নিকট প্রাইভেট না পড়িতে পাঠাইলে তাহার গুণধর পুত্র নিশ্চিত আগামী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করিয়া বসিবেন,এমনকি এখন হইতেই ব্যাবস্থা গ্রহন না করিলে বোর্ডের পরীক্ষা পর্যন্ত তাহার পুত্রের যাওয়া সমুহ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়িয়া যাইবে। মাতৃকুলের হৃদয় সর্বদাই নরম হইয়া থাকে তাহার সন্তানগনের জন্য,তাই মাতাগন অতি সহজেই রাজি হইয়া যাইতেন পুত্রের ভবিষ্যৎ চিন্তা করিয়া। এই বনস্পতি অনেক চেষ্টা করিয়াও আমার বাসার ঠিকানা যোগার করিতে না পাড়িবার কারনে আমাকে আর তাহার প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ হইয়া উঠে নাই। তাহার নিকট না পড়িয়াও এই অধম উচ্চতর গণিতে শুধু লেটার নম্বরই না প্রায় একশত নম্বরের কাছাকাছি পাইয়াছিলেন।

এইবার আসুন শরীরচর্চা শিক্ষকের সহিত অপনাদিগণকে কিঞ্চিৎ পরিচয় করাইয়া দেই। তাহার নাম আমরা দিয়াছিলাম ‘মা কালি” কারন তিনি ছিলেন আমাদিগনের নিকট সাক্ষাৎ যম দূতের ন্যায়। আমার ইশকুলে সপ্তাহে দুই দিন রবিবার এবং বৃহষ্পতিবার ক্লাস শুরু হইবার আগেই এসেম্বলি হইতো সাত সকালেই। তাও আবার আধাঘণ্টা ব্যাপি। নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম কানুন ছিল উহাই দিনের পর দিন,বৎসরের পর মানিয়া এসেম্বিলি সম্পাদন করিতে হইত। এই বান্দর কূল সম্রাটগণ একখানা বুদ্ধি বাহির করিলাম কিভাবে এসেম্বিলীতে না যাওয়া যায়। মা কালি এসেম্বিলি শুরু হইবার পাঁচ মিনিট আগে তাহার নিত্যসঙ্গী তিনফুট দৈর্ঘ্যের সন্ধি বেত লইয়া এত বড় ইস্কুলের তিনটি ফ্লোর সুপারসনিক গতিতে ঢুকিয়া চেক করিতেন কেহ না যাইয়া ক্লাশ রুমের চিপায় চুপায় বসিয়া রহিয়াছেন কিনা এবং যদি দুর্ভাগ্যজনক ভাবে কাউকে পাওয়া যাইত তবে নিউটনিও বলের হইতেও অধিক বল প্রয়োগ করিয়া তাহার সন্ধি বেতের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করিতেন। আমরা গবেষনা করিয়া দেখিলাম উনি একমাত্র বাথরুমে ঢুকিয়া চেক করেন না। আমরা ফন্দি আটিলাম এসেম্বলির সময় বাথরুমে লুকাইয়া থাকিব। যেই ফন্দি সেই কাজ শুরু করিয়া দিলাম।বাথরুমে লুকাইয়া থাকিয়া ওই আধঘণ্টা নিষিদ্ধ চটি চার পাঁচ জন মিলিয়া পরিতাম আর চটির গরম গরম চিত্র গুলাও বেশ উপভোগ করিতে লাগিলাম। কিন্তু বিধি বাম হইয়া দাঁড়াইলো কোনো একজন গুপ্তচর মা কালিকে ইহা জানাইয়া দিলেন। অতঃপর একদিন তিনি বাথরুমে ঢুকিয়া পড়িলেন আর আমরাও যম দূতের নিকট হাতে নাতে ধরা পড়িয়া গেলাম এবং তিন ফুট বেতের তীব্র প্রহারে দৌঁড়াইতে দৌঁড়াইতে এসেম্বিলীর দিকে রওনা দিলাম কিন্তু উনি উসাইন বোল্টের ন্যায় অলিম্পিকের দৌড়ের চাইতেও জোরে দৌড়ায় আর আমাদের প্রহার করিতে করিতে নীচে নিয়া আসিলেন। ইহার পর যত বৎসর ওই ইশকুল নামক সাক্ষাত জেলখানায় ছিলাম কোনোদিন আর এসেম্বিলীতে দেরি করিবার মতো সাহস সঞ্চার করিতে পারি নাই।

এইবার আসুন ইসলামিয়াত শিক্ষকের সহিত একটু পরিচয় পর্ব সারিয়া লই। ভদ্রলোক সৌদি শেখদের ন্যায় জুব্বা পড়িয়া আসিতেন আমাদিগনের ক্লাশ লইতে। কিছুদিনের মধ্যেই উনি টের পাইয়া গেলেন যে, আমরা কয়েকজন আস্ত শয়তান হইলেও আমাদিগনের পরীক্ষার ফল কেমনে কেমনে জানি ভালো হইয়া যাইত। আরও বিপদ বাড়িয়া গেল যখন স্যার দেখিলেন আমার এবং আমার আরেক বন্ধুর আরবি লেখা অত্যন্ত চমৎকার। আপনাদের অনেকেরই হয়তো মনে রহিয়াছে যে,আগে ইসলামিয়াত নামক একখানা বিষয় ছিল এবং উহাতে আপনি কোরানের কিংবা হাদীসের বিভিন্ন অংশ আরবিতে লিখে কোট করিতে পারিলে ভালো নম্বর পাওয়া যাইত। তো উনি ক্লাশে ঢুকিয়াই আমাকে আরবী উচ্চারণ সহকারে ডাকিতেন খায়রুল বাসায়ায়ার যেসওওওরি আর আমার আরেক গুণধর বন্ধুকে উমরিইইই ফায়ায়ায়া রুউউউখ। তো ভদ্রলোকের এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, উনি অন্য ক্লাশে যাইয়াও আমাদিগনের এইরূপ নাম ধরিয়া ডাকিয়া বসিতেন এবং ঐ শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিতে হইত যে,আমরা এই শ্রেণীর ছাত্র নহি।

বিদ্র: ইহা স্বীকার করিয়া লইতেছি যে, এই সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষক/শিক্ষিকাগনকে আমরা সত্যিই অনেক পীড়া দিয়াছি। তারপরেও তাহারা আমাদিগনকে নিজ পুত্রসম ভাবিয়া বৎসরের পর বৎসর শিক্ষা দান করিয়াছিলেন। এমননকি কাছে আসিয়া হাত ধরিয়া বিভিন্ন অক্ষর কিভাবে লিখিলে হাতের লেখা আরও সুন্দর হইবে তাহা দেখাইয়া দিতেন। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিয়াই বলিতেছি, যদি কিছু শিখিয়া থাকি তো আপনাদের কল্যাণেই শিখিয়াছি। আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন, পরমেশ্বরের নিকট প্রার্থনা রইলো তিনি যেন অপনাদিগণকে ভালো রাখেন।